কফিনে শুয়ে স্বজনের কোলে বেদনাবিধুর পরিবেশে ২৩ লাশ হস্তান্তর

কফিনে শুয়ে স্বজনের কোলে বেদনাবিধুর পরিবেশে ২৩ লাশ হস্তান্তর

নিউজ ডেস্ক: সুন্দর করে সাজানো রাশি রাশি ফুল। পাশে ফুলের মতোই প্রিয়ন্ময়ী ও অনিরুদ্ধ। তবে তারা আর সেই চঞ্চল শিশুটি নেই। ঘুমিয়ে আছে কফিনে। এরপর সারি করে একে একে সাজানো হয়েছে বড়দের মরদেহগুলো। কোনো কোনো ফুল পাশ থেকে আলতো করে ছুঁয়ে রেখেছে একেকটি কফিন। ওপরে কাগজে সাঁটানো হয়েছে নাম, পাসপোর্ট নম্বর, বক্সের নম্বর। স্বজনরা কফিন খুঁজে বের করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কেউ কেউ পরম মমতায় কফিনে হাত বোলায়। স্বজনরা একে অন্যকে জড়িয়েও কাঁদে। বুকফাটা কান্নার এই ঢেউ কয়েক ঘণ্টা পর ভাসায় ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামও।
বিকেল সাড়ে ৫টা। ইউএস-বাংলা বিমানের নিহত ২৩ যাত্রীর মরদেহের কফিনগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের জন্য অপেক্ষমাণ। বাবার কোলে চড়ে এসেছে দুই বছর পাঁচ মাস বয়সী শিশু হিয়া। কফিনগুলোর একটিতে রয়েছেন তার মা কেবিন ক্রু শারমীন আক্তার নাবিলা। হিয়ার বাবা ইমাম হাসান বললেন, ‘হিয়া আমাদের একমাত্র মেয়ে। কয়েক দিন ধরেই হিয়া বলছে, মাম্মা অফিসে গেছে। আসতে দেরি হবে।’ বিকেল ৫টা ৩৫ মিনিটে মরদেহগুলো যখন স্বজনদের কাছে হস্তান্তর শুরু হয়, তখন অনেকেই কফিন স্পর্শ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। গতকাল সোমবার বিমানবাহিনীর একটি পরিবহন বিমানে মরদেহগুলো নেপাল থেকে ঢাকায় হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে আনা হয়। সেখান থেকে জানাজার জন্য আনা হয় আর্মি স্টেডিয়ামে। দুপুর ২টার পর থেকেই স্টেডিয়ামে জানাজায় অংশ নিতে অনেকে হাজির হয়। বিকেল পৌনে ৩টা থেকে নিহতদের শোকার্ত স্বজনরা আসতে শুরু করে। তাদের মধ্যে নিহত বিমান ক্রু খাজা হোসাইন মো. শাফির পরিবারের সদস্যরা জানায়, তাদের প্রথমে বিমানবন্দরে যেতে বলা হয়েছিল। পরে সেখান থেকে আর্মি স্টেডিয়ামে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিকেল ৫টা ১০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা কফিনগুলো বহন করে স্টেডিয়ামের পশ্চিম প্রান্তে একটি মঞ্চে সারিবদ্ধভাবে রাখতে শুরু করেন। জানাজা শুরু হয় আসরের নামাজের পর। পরে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে তাঁর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সারোয়ার হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কফিনে পুষ্পস্তবক দিয়ে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। জানাজায় মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম মাহমুদ আলী, বিমানমন্ত্রী শাহজাহান কামাল, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এবং সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানরাসহ তিন বাহিনীর কর্মকর্তাদের অনেকে অংশ নেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ ও মোহাম্মদ শাহজাহান, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবীর খোকনও এতে শরিক হন। জানাজার পর ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী গণভবনে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করবেন। বিকেল ৪টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১ নম্বর ভিভিআইপি টার্মিনালের সামনে বিমানবাহিনীর একটি সি-১৩০ পরিবহন বিমান অবতরণ করে নেপালে ইউএস-বাংলার বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের পাইলট, কো-পাইলট, কেবিন ক্রুসহ ২৩ যাত্রীর লাশ নিয়ে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বিমানমন্ত্রী, বিমানবাহিনীর প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ৪টা ১৫ মিনিটে বিমানবাহিনীর কফলিফটার দিয়ে বিমানের ভেতর থেকে কফিনগুলো বের করতে থাকেন বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা। সারিবদ্ধ কফিন দেখে অনেকে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ে। বিমান অবতরণের আগেই আলিফ পরিবহনের লাশবাহী গাড়িগুলো সারিবব্ধভাবে রাখা হয়। লাশ আনাকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দর এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়। এর আগে নেপালের কাঠমাণ্ডুয় বাংলাদেশ দূতাবাসের পাকা উঠানে মৌলানা শফিকুর রহমান নিহতদের স্বজন, দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় কিছু মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যদের নিয়ে জানাজা সারেন। নিহতদের পরিবারের নারী স্বজনরা ছলছল চোখে অপলক তাকিয়ে ছিল একেকটি কফিনের দিকে। তাদের সঙ্গেই ছিলেন নেপালে বাংলাদেশর রাষ্ট্রদূত মাসফি বিনতে শামস। পরে স্বজনরা কফিন খুঁজে বের করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কেউ কেউ পরম মমতায় কফিনে হাত বোলায়। স্বজনরা একে অন্যকে জড়িয়েও কাঁদে। উপস্থিত সবার এ সময় দৃষ্টি কাড়ে প্রিয়ন্ময়ী ও অনিরুদ্ধর কফিনের দিকে। প্রিয়ন্ময়ীর বাবা প্রিয়কের মরদেহ একই প্রাঙ্গণে থাকলেও মা-মেয়ের কফিনের মাঝে ছিল অনেক দূরত্ব। পরে বাবা ও মেয়ের সন্তানের মরদেহ উঠেও যায় আলাদা দুই পরিবহনে। নেপালে সকাল ৭টা থেকেই দূতাবাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কাঠমাণ্ডু টিচিয় মেডিক্যালের মর্গ থেকে দুটি বড় আকারের কাভার্ড ভ্যান আর একটি জিপে করে ২৩ বাংলাদেশির মরদেহ দূতাবাসে নিয়ে আসতে শুরু করেন। সামনে-পেছনে নেপালি পুলিশের কর্ডনের মধ্য দিয়ে ৮টা নাগাদ মরদেহগুলো পৌঁছানো হয় দূতাবাস প্রাঙ্গণে। জানাজা শেষ করেই আবার মরদেহগুলো একই কাভার্ড ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ত্রিভুবন বিমানবন্দরে। এই বিমানবন্দরের রানওয়েতে অবতরণকালেই গত ১২ মার্চ মারা যান মোট ৪৯ জন। এর মধ্যে ২৬ জন বাংলাদেশি, ২২ জন নেপালি ও একজন চীনা রয়েছেন। দূতাবাস থেকে সকাল ৯টা নাগাদ মরদেহগুলো বিমানবন্দরে নেওয়া হলেও বাংলাদেশ থেকে আসা বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমানটি মরদেহগুলো নিয়ে দেশের উদ্দেশে আকাশে উড়াল দেয় দুপুর আড়াইটায়। এর এক ঘণ্টা আগে নিহতদের স্বজনদের নিয়ে ইউএস-বাংলার আরেকটি বিশেষ ফ্লাইট ছেড়ে যায় ঢাকার উদ্দেশে। বাংলাদেশ থেকে আসা মেডিক্যাল টিমের সদস্যরাও যান ওই ফ্লাইটে। সঙ্গে করে তাঁরা নিয়ে গেছেন সর্বশেষ কাঠমাণ্ডু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে থাকা বাংলাদেশি আহত যাত্রী কবির হোসেনকে। নরভিক হাসপাতালের ইয়াকুব আলী গেছেন দিল্লিতে। দুপুর সোয়া ২টায় (নেপালের স্থানীয় সময় ২টা) নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে লাশবাহী ৬১-২৬৪০ নম্বর বিমানটি। এর কিছুক্ষণ আগে নিহতদের স্বজনদের নিয়ে ইউএস-বাংলার আরেকটি বিমান ঢাকায় এসে পৌঁছে। মরদেহ গ্রহণের জন্য উপস্থিত হন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল, বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার, সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল নাইম আহম্মেদসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ সময় সাংবাদিকদের ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নেপালে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার পর থেকেই শেখ হাসিনার সরকার স্বজনহারাদের পাশে ছিল, আছে এবং থাকবে। আর্থিক সহযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে। তবে কী সহযোগিতা করা হবে এ ব্যাপারে তিনি নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। বিমানমন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল বলেন, ব্ল্যাকবক্স উদ্ধার করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত হচ্ছে। সময়মতো সব কিছু শেষ হবে বলে জানান তিনি। বিমান সূত্র জানায়, নিহত ২৬ বাংলাদেশির মধ্যে ২৩ জনের লাশ দেশে আনা হয়। তাঁরা হলেন বেগম হুরুন নাহার বিলকিস বানু, এস এম মাহমুদুর রহমান, ফয়সাল আহমেদ, বিলকিস আরা মিতু, নাজিয়া আফরিন চৌধুরী, আখতারা বেগম, মো. রকিবুল হাসান, মো. রফিকুজ্জামান, সানজিদা হক, অনিরুদ্ধ জামান, মো. হাসান ইমাম, তামারা প্রিয়ন্ময়ী, তাহারা তানভীন শশী রেজা, ফ্লাইটের পাইলট আবিদ সুলতান, কো-পাইলট পৃথুলা রশীদ ও মিনহাজ বিন নাসির, আঁখি মনি, এফ এইচ প্রিয়ক, শারমীন আক্তার নাবিলা, উম্মে সালমা, মো. মতিউর রহমান, খাজা হুসাইন ও মো. নুরুজ্জামান।

Leave a Reply