আদিবাসী দের জীবন করোনা কালে

অনলাইন ডেস্ক: করোনার মতো জীবাণুবাহী মহামারির কাছে ধনী, নির্ধন, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গের কোনো ভেদাভেদ নেই। নির্বিচারে যে কাউকেই সংক্রমিত করে রোগ বাঁধিয়ে ফেলতে পারে। ঠেলে দিতে পারে মৃত্যুর দিকে। কিন্তু করোনার কারণে উদ্ভূত আর্থসামাজিক সংকটের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়ছে না। একইভাবে কোনো দেশের প্রান্তিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনের ওপর আর ক্ষমতাসীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে করোনার প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রটিতে রয়েছে বিস্তর ফারাক। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভাগ পাওয়া না-পাওয়ার সঙ্গে যে বস্তুগত উন্নয়ন ও বণ্টনের মতো বিষয়-আশয় জড়িত, সে পার্থক্যটি এখানে বিবেচনার দাবি রাখে। আর এখানেই চলে আসে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িসহ সমতলের আদিবাসীদের শোচনীয় জীবনযাপনের গল্প।

আমরা (উপরোল্লেখিত লেখকরা) বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ শুরু ও এর পরে লকডাউন ঘোষণার পর থেকে নিজেদের উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষত দুর্গম পাহাড়ি গ্রামগুলোতে এর প্রভাব নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে আসছি। তথ্য সংগ্রহ করেছি বিভিন্ন এলাকায়। আমাদের সংগৃহীত তথ্য ও পর্যবেক্ষণের মতে অধিকাংশ পাহাড়ি পরিবার হচ্ছে দিনমজুর ও প্রান্তিক জুমচাষি; যাদের খাদ্যসহ মৌলিক চাহিদা মেটে দৈনিক মজুরি না হয় জুম ও বন জঙ্গলের আহরিত সামান্য সবজি, ফলমূল ও অন্যান্য দ্রব্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে। এসব প্রান্তিক মানুষের শতকরা ৬১ ভাগের এক সপ্তাহ কিংবা তারও কম দিন চলার মতোও কোনো খাদ্য মজুদ নেই। অন্যদিকে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে বিতরণ করা চাল পাহাড়ের প্রতি পরিবার গড়ে পেয়েছে ১০ কেজির মতো। যা পরিবারপিছু গড়ে দুই থেকে তিন কেজি চালের চাহিদা হিসাবে ধরলে মাত্র তিন থেকে চার দিনের খোরাক।

প্রধানমন্ত্রীর এককালীন ২৫০০ টাকা করোনা ত্রাণ, বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে প্রদত্ত আর্থিক সাহায্য কদাচিৎ পৌঁছেছে এসব এলাকায়। এর মধ্যে গ্রাম পর্যায়ে সীমিত পরিসরে যে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা-স্বাস্থ্য- চিকিৎসাসহ নানান উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চলত, সেগুলো এখন কার্যত বন্ধ। এর পরিপ্রেক্ষিতে মানবিক বিপর্যয় আসন্ন যদি নিয়মিত ও পর্যাপ্ত খাদ্য ও আর্থিক সাহায্য এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রদান করা না হয়। এ ছাড়া সুপেয় পানীয়জল, যোগাযোগের জন্য রাস্তা ও যানবাহন, বিদ্যুৎ সেবা বলতে গেলে এসব এলাকায় নেই। টিভি বা ইন্টারনেটে চলমান অনলাইন ক্লাসগুলোতে পাহাড়ি ছেলেমেয়েরা যে অংশগ্রহণ করবে, জলবাহিত রোগ প্রতিরোধ করবে, রোগাক্রান্ত হলে চিকিৎসা সেবা পাবে- এ ধরনের সুযোগ ও সামর্থ্য প্রান্তিক ও দুর্গম অঞ্চলে থাকা পাহাড়িদের নেই। তাই খাবার ও আর্থিক সাহায্যের মতো এই বিষয়গুলোতে গুরুত্বসহকারে দৃষ্টি দেওয়ার দাবি রাখে করোনার মতো রোগ প্রতিরোধ ও করোনা সৃষ্ট অন্যান্য সমস্যাসহ করোনা-পূর্ব সময় থেকে পাহাড়ে বিদ্যমান আর্থসামাজিক সমস্যাগুলোকে মোকাবিলা করার জন্য।

বাংলাদেশের পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের প্রান্তিক আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে যথাযথভাবে সমাধান করতে গেলে যুগযুগান্তর ধরে চলে আসা বঞ্চনার আখ্যান ও কাঠামোকে অবশ্যই আমলে নিতে হবে। এর মধ্যে নতুন করে ওপরে বর্ণিত করোনা পরিস্থিতি যোগ হয়েছে মাত্র।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের আর্থসামাজিক প্রান্তিকতার শুরুটা হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিকীকরণের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চক্রান্ত করে বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করার পরে ১৭৬০ সালে নবাব মির কাশিমের কাছ থেকে অধুনা ভারতের মেদিনীপুর, বর্ধমান ও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার দেওয়ানি স্বত্ব লাভ করে। সেই দেওয়ানি স্বত্ব মোতাবেক ব্রিটিশদের দখলকৃত তৎকালীন চট্টগ্রামের আয়তন ছিল ২৯৮৭ বর্গমাইল, যা বর্তমান চট্টগ্রাম জেলার (৩২৮৩ বর্গমাইল) চেয়েও আকারে ছোট। ঠিক একশ’ বছর পরে পাহাড়ি অধ্যুষিত বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামকেও দখল করে ব্রিটিশরা। পার্বত্য চট্টগ্রামের বনভূমির কাঠ ও প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের সম্ভাব্য উপায় হিসেবে সেখানকার ভূমির ওপর দখলি স্বত্ব কায়েম করার জন্য ব্রিটিশদের প্ররোচিত করে। ১৮৬৫ সালে রিজার্ভ ফরেস্ট আইন প্রবর্তিত হয় এবং ১৮৭০ দশকে পাহাড়ের এক-চতুর্থাংশ বনভূমি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পরিণত করা হয়। জুমিয়া কৃষকদের ভূমি ও জীবিকার অধিকার কেড়ে নিয়ে সেখানে নিষিদ্ধ করা হয় জুম চাষ। এর পরে বাকি যেসব জায়গা স্থানীয়দের কাছে বসতভিটা, পশু শিকার ও চারণ ভূমি, জুম চাষ ও সামষ্টিক মালিকানার বন হিসেবে যুগ যুগ ধরে পরিচিত, সেগুলো আনক্লাসড স্টেট ফরেস্ট বা অশ্রেণিভুক্ত বনের অধীনে নিয়ে নেওয়া হয়। এখানেও তাই সব বনভূমিকে কার্যত সরকারি বা জাতীয় মালিকানার অধীনে নিয়ে নেওয়া হয়। ফলে আদিবাসী পাহাড়িদের জন্য এসব জায়গার মালিকানা হারিয়ে সরকারের মাধ্যমে যে কোনো সময় উচ্ছেদ হওয়া কিংবা রাষ্ট্রের চোখে অবৈধ দখলদার হিসেবে পরিগণিত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়।

পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ‘উন্নয়ন’-এর নামে আদিবাসীদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদের প্রক্রিয়াটি আজও চলমান। সাম্প্রতিককালে স্থানীয় ও বহিরাগত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বাগান, ট্যুরিস্ট স্পটসহ নানান বাণিজ্যিক প্রকল্পের জন্য পাহাড়িদের ভূমি ও বসতভিটা দখল করে চলেছে। এমতাবস্থায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে উত্তর ঔপনিবেশিক জাতি রাষ্ট্রে ঐতিহাসিকভাবে চলে আসা দারিদ্র্যকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের দিনমজুর ও প্রান্তিক জুমিয়া জনগোষ্ঠীতে পরিণত হওয়া কোনো বিস্ময়কর বিষয় নয়।

করোনার সময়ে তাৎক্ষণিক খাদ্য ও আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিকভাবে চলে আসা বঞ্চনার কাঠামোগত বিষয়কেও তাই আমলে নেওয়া আবশ্যক। দরকার আদিবাসীদের ভূমি, সংস্কৃতি ও জীবনের ওপর অধিকারের স্বীকৃতি। যে কোনো মাপকাঠিতে সভ্য, মানবাধিকার ও সত্যিকারের উন্নয়নে বিশ্বাসী, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার ও সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।
লেখকরা গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

ছবি: সংগৃহীত