এবার গোয়েন্দারা জুয়ার মেশিন আমদানিকৃতদের সন্ধানে

0
74

নিউজ ডেস্ক: রাজধানী ঢাকার ক্যাসিনোগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে অত্যাধুনিক জুয়ার মেশিন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এগুলো আমদানী করা হয়েছে। ৫ বছর ধরে নামে-বেনামে অথবা মিথ্যা ঘোষণায় ক্যাসিনো সরঞ্জাম বাংলাদেশে আমদানি করা হচ্ছে।

জুয়া খেলার মেশিন আমদানিতে ইতিমেধ্য কয়েকশ’ কোটি টাকা বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মূলত খেলাধুলার সরঞ্জাম আমদানির আড়ালে জুয়া খেলার সরঞ্জাম আনা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এসব সরঞ্জাম আমদানি হলেও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এতদিন তা আমলে নেয়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম রোববার বলেন, জুয়া খেলার মেশিনসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানির সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে ইতিমধ্যে আমরা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছি।

আমদানিকারকরা এখন পর্যন্ত এ ধরনের কতগুলো সরঞ্জাম আমদানি করেছেন তা উদঘাটন করা হবে। আমদানি নীতিবহির্ভূতভাবে এসব আমদানি করা হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। একই সঙ্গে শুল্ক ফাঁকির বিষয়টিও উদঘাটনের চেষ্টা করবে শুল্ক গোয়েন্দা।

সূত্র জানায়, দুটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সরাসরি জুয়া খেলার বিভিন্ন সরঞ্জাম আমদানির সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে একটির নাম হল পুষ্পিতা এন্টারপ্রাইজ। এ প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা হল- ১৮ দক্ষিণ কমলাপুর। অপর প্রতিষ্ঠানের নাম এ বি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল। যার ঠিকানা ১৪ মোহাম্মদিয়া হাউজিং, মোহাম্মদপুর।

এ দুটি প্রতিষ্ঠান আমদানি ঘোষণাপত্রে আমদানি পণ্যের বিবরণ হিসাবে ‘গেম মেশিন’র কথা উল্লেখ করেন। পণ্যের বিস্তারিত বিবরণ হিসাবে লেখা হয়, ক্যাসিনো ওয়ার গেম, রুলেট, পুকার সেট ও পুকার চিপ। দুটি বন্দর ব্যবহার করে ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে। বেনাপল কাস্টমস ও কমলাপুর আইসিডি থেকে পণ্যগুলো খালাস করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পশ্চিমা বিশ্বের ক্যাসিনোতে রুলেট ও স্লাট মেশিনে কোটি কোটি টাকার জুয়া খেলা হয়। এছাড়া পোকার নামের এ ধরনের সুসজ্জিত জুয়ার বোর্ড থাকে ক্যাসিনোতে। আন্তর্জাতিক জুয়া নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে ক্যাসিনোতে রুলেট ও স্লট মেশিন থাকা বাধ্যতামূলক।

কারণ ক্যাসিনোতে নগদ অর্থের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত চিপ নামের বিশেষ ধরনের ঘুঁটি বিশ্বের যে কোনো ক্যাসিনোতে ভাঙিয়ে নগদ টাকায় রূপান্তর করা যায়। রুলেট ও স্লট মেশিন ছাড়া কোনো ক্যাসিনোই পূর্ণতা পায় না। বৃহদাকারের ক্যাসিনোতে জুয়া খেলার জন্য ১ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার চিপ ব্যবহৃত হয়। তবে ঢাকার বিভিন্ন ক্যাসিনোতে ১ হাজার, ১০ হাজার, ৫০ হাজারসহ বিভিন্ন মূল্যমানের রংবেরঙের চিপ ব্যবহৃত হয়।

সূত্র বলছে, রুলেট মেশিনের একটি সেটে দুটি অংশ থাকে। একটি অংশ কাঠ দিয়ে তৈরি, গোলাকার পাত্রের মতো। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি বড় টেবিল। সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি গোলাকার পাত্রের মতো রুলেট মেশিনে শূন্য থেকে ১শ’ পর্যন্ত গাণিতিক সংখ্যা বসানো থাকে।

পাশের টেবিলে মখমল কাপড়ের ওপর লেখা গাণিতিক সংখ্যার ওপর জুয়াড়িরা চিপ রেখে বাজি ধরেন। এরপর মার্বেল আকারের একটি বল রুলেট মেশিনের মধ্যে কাঠির সাহায্যে প্রচণ্ড বেগে ঘুরিয়ে দেয়া হয়। ঘুরতে ঘুরতে বলটি যেখানে থামে সেখানকার সংখ্যাটির ভিত্তিতে হাতেগোনা কয়েকজন জুয়াড়ি অর্থ পান। বাকিরা হেরে যান।

এই মেশিনের সাহায্যে একসঙ্গে ১শ’ জন জুয়াড়ি বাজি ধরতে পারেন। ক্যাসিনোতে জুয়া খেলার স্লট মেশিনটি মূলত একটি ডিজিটাল গেম। কয়েন দিয়ে খেলা যায় এমন মেশিনের মতোই স্লট মেশিনে চিপ ঢোকানোর পর ডিজিটাল পর্দায় গাণিতিক সংখ্যাগুলো ঘুরুতে শুরু করে। কয়েক সেকেন্ড পর একটি সংখ্যার ওপর পর্দা স্থির হয়ে যাওয়ার পর জুয়াড়িদের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়। স্লট মেশিনে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ১ থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত জয়-পরাজয় হয়ে থাকে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঢাকার কয়েকটি ক্লাবের ক্যাসিনো হল থেকে রুলেট ও স্লট মেশিন জব্দ করা হয়েছে। অথচ ক্লাব কর্তৃপক্ষ সেগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করেছেন তার তথ্য দিতে পারেননি। সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক মেশিনগুলো কার কাছে কত দামে বিক্রি করেছেন তারও কোনো তথ্য নেই।

তবে অবিশ্বাস্য কম মূল্য দেখিয়ে রুলেট ও স্লট মেশিনসহ ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানি করা হয়েছে। প্রতিটি রুলেট মেশিনের আমদানি মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ২৩ ডলার। এছাড়া জুয়া খেলায় ব্যবহৃত প্লাস্টিকের চিপের আমদানিমূল্য দেখানো হয় প্রতি পিস মাত্র ১৬ ডলার করে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার একটি ক্যাসিনো মালিক রোববার বলেন, রাজধানীর ক্যাসিনোগুলোতে ব্যবহৃত রুলেট মেশিনের দাম ২০ থেকে ৫৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। আর স্লট মেশিনগুলোর দাম ৩০ থেকে ৭০ লাখের মধ্যে। এছাড়া পোকার টেবিলের বেশির ভাগই স্থানীয়ভাবে তৈরি।

কিছু কিছু উন্নত পোকার টেবিল ১২-১৫ লাখ টাকা করে চীন থেকে আমদানি করা হয়। এগুলো আমদানির সঙ্গে ঢাকার ক্যাসিনোতে কর্মরত বেশ কয়েকজন নেপালি নাগরিকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এদের একজনের নাম রাজকুমার।