করোনা টিকার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়

জাকির হোসেন সৈকত,ফরিদগঞ্জ:ফরিদগঞ্জে এক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধো খামখেয়ালীপনা ও চতুর্থ শ্রেনী কর্মচারী নিয়োগে অনিয়েমের অভিযোগ উঠে। তবুও এম.পি.ও-ভূক্ত হয়েছেন অভিযুক্ত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। অভিযোগ মোতাবেক, অনিয়মের ওই যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন প্রধান শিক্ষক।

এছাড়া, করোনা ভাইরাস এর টিকা গ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় ও খামখেয়ালিপনা চলাপেরা অভিযোগও করেছেন অভিভাবক মহল। ম্যানেজিং কমিটির দোহাই দিয়ে চলে সকল অপকর্ম।

এ বিষয়ে কিছুই জানেনা বলে অভিযোগ করে কমিটির লোকজন। এসব অভিযোগ উঠেছে ফরিদগঞ্জ পৌর এলাকার ‘পূর্ব বড়ালী শাহ্জাহান কবির উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নেছার আহাম্মদের বিরুদ্ধো। এতে, অভিভাবক মহল ক্ষুব্ধ। প্রতিকার দাবী করেছেন যথাযথ দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কাছে।

সূত্রে জানা গেছে, পৌর এলাকার পূর্ব বড়ালী গ্রামে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘পূর্ব বড়ালী শাহ্জাহান কবির উচ্চ বিদ্যালয়’। প্রথমে প্রায় দেড় বছর প্রধান শিক্ষক এর দায়িত্ব পালন করেন নাছির উদ্দিন। এরপর নিয়োগ দেয়া হয় নেছার আহম্মদকে। প্রতিষ্ঠার পর ২০১৯ সালের জুলাই মাসে বিদ্যালয় এম.পি.ও-ভূক্ত হয়।

এম.পি.ও-তে প্রধান শিক্ষকসহ মোট ৪ জন শিক্ষক, একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ও শামিম বেপারী নামে একজন নিরাপত্তা কর্মীর নাম অন্তর্ভূক্ত হয়। কিন্তু, শামিম বেপারীর নিয়োগের বৈধতা নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন উঠেছে।কতো তারিখে নিয়োগ পেয়েছেন- এমন প্রশ্নে শামিম বেপারী নির্দিষ্টভাবে তারিখ না জানিয়ে বলেছেন “২০১৯ সালের জুলাই মাসে”। তিনি জানান, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন ও নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে তার নিয়োগ হয়েছে।

“পরীক্ষায় মোট চার জন প্রার্থী উপস্থিত ছিলেন”- দাবী করেছেন শামিম বেপারী। নিয়োগ বোর্ডে প্রধান শিক্ষক ও একজন সরকারী কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি শাহ্জাহান কবিরসহ অন্য কেউ ছিলেন কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “না আর কেউ ছিলেন না”। কোন্ মাসে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছে- এ প্রশ্নে তিনি বলেন “মনে নেই”। নিয়োগ প্রাপ্তির পর স্কুল থেকে প্রায় ১২ মাস যথাক্রমে ১১ ও ১৭ শত টাকা বেতন পেতেন।

কিন্তু, ২০২০ সালের জুলাই মাসে এম.পি.ও হওয়ার মাস হতে স্কুল থেকে তাকে কোনো বেতন দেওয়া হয় না। প্রধান শিক্ষক দাবী করেছেন, শামিম বেপারীকে স্কুল থেকে ১৬৯১ টাকা বেতন দেওয়া হয়। শামিম বেপারীর দাবীর বিষয়ে স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি পুনরায় বলেন, ওই ১৬৯১ টাকা একটি খাতে টাকা কাটা হয়। কি সে খাত- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কাগজপত্র দেখে বলতে হবে।

আপনার নিয়োগপত্র দেখাতে পারবেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, নিয়োগপত্র স্যার (প্রধান শিক্ষক) এর কাছে।সূত্র মোতাবেক, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। সে বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী কাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে- এমন প্রশ্নে কারও নাম জানা যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ফরিদগঞ্জ পৌর এলাকার যথাক্রমে মো. তাফাজ্জল, মো. মনির ও কুষ্টিয়া জেলার মো. সেলিম নিরাপত্তা কর্মীর পদে বিভিন্ন সময়ে চাকরি করেছেন।

তারা আরও বলেছেন, প্রধান শিক্ষকের যখন ইচ্ছা হয়েছে- তখনই নিরাপত্তা কর্মীকে বরখাস্ত করেছেন। নিরাপত্তা কর্মীকে মারধরও করার অভিযোগও রয়েছে।জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বলেছেন, নিয়ম মোতাবেক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, নিয়োগ বোর্ড ও পরীক্ষার মাধ্যমে ২০১২ সালে শামিম বেপারীর নিয়োগ হয়েছে। শামিম বেপারী বলেছেন, তার নিয়োগ ২০১৯ সালের জুলাই মাসে।

শুনে প্রধান শিক্ষক বলেন, নতুন স্কুল করতে অনেক নিয়ম মানা যায় না। নিয়োগবিধির কোন্ ধারায় এমনটা উল্লেখ আছে। এমন প্রশ্নে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। ২০১২ সালে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কাউকে নিয়োগ দিয়েছেন কি না- এ প্রশ্নেও তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। শামিম বেপারীর নিয়োগ বৈধ কি না- এমন প্রশ্নে তিনি “বৈধ” দাবী করে বলেন, নিয়োগ ব্যাক ডেইটে দেখানো হয়েছে।

নতুন স্কুলের বেলায় সবাই এমন করে। নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির স্বাক্ষর রয়েছে। শামিম বেপারীর নিয়োগের জন্য কোনো পরীক্ষা হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “না, কোনো পরীক্ষা হয়নি”।সূত্র মোতাবেক, পূর্ব সমঝোতা মোতাবেক শামিম বেপারীকে প্রধান শিক্ষক এর কাছে নিয়ে যান জনৈক শাহ্ আলম। নিয়োগ প্রাপ্তির জন্য তার মাধ্যমে টাকা লেনদেন হয়েছে। জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বলেন, এমন ঘটনা সত্য নয়, তবে কাগজপত্রের খরচ বাবদ যা খরচ হয়েছে- শামিম বেপারী তাই দিয়েছে।

টাকা লেনদেন এর অভিযোগ শামিম বেপারীও অস্বীকার করেছেন।বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টজন ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, শামিম বেপারী’র নিয়োগ বৈধ নয়। তিনি ২০১৯ সালের জুলাই মাসে বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। অথচ, তার নিয়োগ দেখানো হয়েছে ২০১২ সালে। এর পূর্বে নিরাপত্তা কর্মীর পদে চাকরি করেছেন তাফাজ্জল হোসেন, মনির হোসেন ও কুষ্টিয়া জেলার মো. সেলিম।

কিন্তু, এম.পি.ও’র পূর্বে হঠাৎ করেই শামিম হোসেনকে নিরাপত্তা কর্মীর পদে নিয়োগ দেন প্রধান শিক্ষক। পরে অবৈধভাবে কাগজপত্র সৃজন করে সুবিধাজনক সময়ে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির স্বাক্ষর নিয়ে নেন বলে অভিযোগ উঠেছে।কয়েকজন অভিভাবক অভিযোগ করে বলেছেন, করোনা ভাইরাসের টিকা গ্রহণ কেন্দ্র করে পরিবহন ও যোগাযোগের অজুহাতে ২৯০ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৬০ টাকা হারে আদায় করেছেন প্রধান শিক্ষক।

টিকার ক্যাম্প ছিলো স্কুল থেকে সর্বোচ্চ পঁাচ মিনিটের পায়ে হঁাটা পথ বড়ালী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সকালে যাওয়ার সময়ে কয়েকটি ইজিবাইকে শিক্ষার্থীদের উঠিয়েছেন ঠিকই। তবে, অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্যাম্পে গেছে পায়ে হেঁটে।

ফেরার সময়ে কোনো পরিবহন পাওয়া যায়নি। এসব কারণে অভিভাবকগণ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, এখানেও সামান্য কিছু টাকা আত্মসাতের লোভ সামলাতে পারেননি তিনি।স্কুলের শিক্ষার্থীরা বলেন, টিকা কেন্দ্র নিবে বলে আমাদের কাছ থেকে ৬০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে।

আমাদের টিকা কেন্দ্র কাছে থাকায় আমরা হেটে চলে যাই এবং চলে আসি। বিদ্যালয়ের প্রতিবেশি হুমায়ুন কবির (৫৫), মো. মোক্তার (৫০) দুঃখ করে বলেছেন, শামিম বেপারীকে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করেন প্রধান শিক্ষক। তিনি নিজের বাড়ির দ্বন্দ্বে শামিমকে ডেকে নেন। এতে, শামিম বেপারী ওই এলাকার লোকজনের পিটুনি খেয়েছেন।

তারা, প্রধান শিক্ষককে স্বেচ্ছাচার বলে মন্তব্য করেছেন। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রসারের উদ্যেশ্যে জমি, ভবন ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন এলাকার জনহিতকর ব্যক্তি শাহ্জাহান কবির। তিনি একজন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী।

শুরু হতে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন শাহ্জাহান কবির। তার সরলতার সুযোগ বিদ্যালয়ে দুর্নীতির আখড়া গড়ে তুলেছেন প্রধান শিক্ষক। জানতে চাইলে সভাপতি শাহ্জাহান কবির বলেন, ব্যবসার সূত্রে ঢাকা ও দেশের বাইরে আমাকে থাকতে ও যাতায়াত করতে হয়। বিদ্যালয় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য প্রধান শিক্ষককে সুযোগ দিয়েছি।

অনেক সময়েই আমার কাছ থেকে আগাম সহি-স্বাক্ষর নেন তিনি। স্কুল পরিচালনার স্বার্থে আমি স্বাক্ষর দিয়েছি। এ ব্যপারে কথা হয় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শাহ্ আলী রেজা আশরাফী’র সঙ্গে। তিনি বলেছেন, আমি ফরিদগঞ্জে যোগদান করেছি ২০১৯ সালে। এ সময়ে অত্র বিদ্যালয়ে কোনো নিয়োগ পরীক্ষা হয়নি। ২০১৯ সালে এ বিদ্যালয়ের এম.পি.ও’র ফাইলপত্র আমিই উর্ধতন কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠিয়েছি।

তবে, এটা সঠিক নয় যে, নতুন বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ব্যাক ডেইটে নিয়োগ দেয়া যায়। এমন করা হলে তা অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। আমি ২/৩ দিনের মধ্যে বিদ্যালয়ে যাবো, তখন শামিম বেপারীর নিয়োগ প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখবো। টিকার যাতায়াত বাবদ টাকা কেন নিলো আমি বুজতে পারিনা। কারন তাদের কেন্দ্র তো কাছে ছিলো তারা কেনো টাকা নিবে। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখবো।