গাইবান্ধায় প্রথম আলো ট্রাষ্টের ত্রাণ বিতরণ

গাইবান্ধা প্রতিনিধি : পাখি বেগমের (৫০) বাড়ি গাইবান্ধার গোঘাট গ্রামে। গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের অন্তর্গত গ্রামটি। এবারের বন্যায় তার দুইটি ঘর ডুবে গিয়েছিল।

এখন পানি কমে আঙ্গিনা জেগে উঠেছে। পানিতে ডুবে ঘরের বেড়া ও আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তিনি অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন। যা পেতেন তা দিয়ে কোনমত চার সদস্যের সংসার চলতো। কিন্তু বন্যার কারণে ঝিয়ের কাজ চলছে না। ধারদেনা করে চলছেন। এখন ধারও পাচ্ছেন না। প্রতিদিন চেয়ারম্যানের কাছে যাচ্ছিলেন। কিন্তু কোনো ত্রাণ বা চাল পাচ্ছিলেন না। 

সেই পাখি বেগম মঙ্গলবার প্রথম আলো ট্রাষ্টের ত্রাণ পেলেন। ত্রাণ হিসেবে তিনি পাঁচ কেজি চাল, এক কেজি লবন, এক কেজি আলু এবং আধা কেজি মসুরের ডাল পান। ত্রাণ পেয়ে পাখি বেগম বললেন, বানের পানিত ঘর দুইটে নসটো হচে। দুইবেলা খাবারই পাইনে, ঘর ভালো করমো ক্যামন করি। এ্যাকনা ইলিপের জন্নে চেরমেনের বাড়িত গেচিনো, হামাক ইলিপ দ্যায় নাই। আচকে তোমার ঘরে আলোর চাউল পায়া উপোক্যার হলো বাবা। 

পাখি বেগমের মত মঙ্গলবার কামারজানি ইউনিয়নের গোঘাট, কড়ইবাড়ি ও পারদিয়ারা গ্রামের ১০০ জন বন্যার্ত নারী-পুরুষ প্রথম আলো ট্রাষ্টের ত্রাণ পেয়েছেন। প্রত্যেককে পাঁচ কেজি চাল, এক কেজি লবন, এক কেজি আলু এবং আধা কেজি মসুরের ডাল দেওয়া হয়। সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে এসব ত্রাণ বন্যার্তদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।  

মঙ্গলবার সকালে গাইবান্ধা প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্যরা পিকআপ ভ্যানে ত্রাণ নিয়ে রওনা দেন। গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে কামারজানিতে তারা ত্রাণের প্যাকেট নিয়ে যান। এরপর দুপুর একটায় কামারজানি মার্চেন্টস উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এসব ত্রাণ বিতরণ করা হয়। ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। 

          বিতরণ পুর্ববতর্ী এক সংক্ষিপ্ত সভায় বক্তব্য দেন পুলিশ সুপার, গাইবান্ধা সদর থানার ওসি খান মো. শাহরিয়ার, কামারজানি মার্চেন্টস উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারুকুল ইসলাম। বক্তব্যে পুলিশ সুপার বলেন, প্রথম আলোর ত্রাণ বিতরণের এই উদ্যোগ অনেক প্রশংসার। কেননা করোনার মধ্যে বন্যা এসেছে। বন্যা ও করোনা এই দুইটি বিপর্যয়ে মানুষ বিপাকে পড়েছেন। এই সংকটের সময় প্রথম আলো তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। পত্রিকাটি সবসময় অসহায় মানুষের পাশে থাকে, এটা ভাল উদ্যোগ। সবার উদ্দেশ্যে পুলিশ সুপার বলেন, কোন শিশুকে বাল্যবিয়ে দেবেন না ও এলাকায় কোন দুস্কৃতিকারী থাকলে পুলিশকে জানাবেন। পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবে। কামারজানি মার্চেন্টস উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারুকুল ইসলাম বলেন, পত্রিকার কাজ সংবাদ প্রচার করা। কিন্তু প্রথম আলো ব্যতিক্রম। পত্রিকাটি মানবিক মুল্যবোধ থেকে যে ত্রাণ বিতরণ করছে, তা মহৎ উদ্যোগ। এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকুক। 

এসময় উপস্থিত ছিলেন সমাজকমর্ী সাদ্দাম হোসেন পবন, গাইবান্ধা প্রথম আলো বন্ধুসভার উপদেষ্টা নাহিদ হাসান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সরকার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিল্লাত হোসাইন ও ওবায়দুল ইসলাম, অর্থ সম্পাদক মেহেদী হাসান, অনুষ্ঠান সম্পাদক লিমন প্রধান, যোগাযোগ সম্পাদক রিপন আকন্দ, সদস্য সানজিদা রহমান, ইমরান মাসুদ, আবু সাঈদ ও নিশাদ বাবু এবং সাংবাদিক রওশন আলম পাপুল, প্রথম আলোর গাইবান্ধা প্রতিনিধি শাহাবুল শাহীন তোতা প্রমুখ। 

ত্রাণ পেয়ে কড়াইবাড়ি গ্রামের রিকশাচালক ফারুক মিয়া (৪৫) নিজের ভাষায় বললেন, করোনাত কসটো করব্যার নাগচি। বাইরে বারান যায় না। বান আসি অবস্থা খারাপ হচে। বানের পানিত ধানচাউল ভাসি গেচে। দশদিন থাকি কসটো করি পানির মদ্দে আচি। বানের মদ্দে কোনো ইলিপ পাই নাই। তোমারঘরে পোত্তম আলোর ইলিপকোনা পায়া উপক্যার হলো। ত্রাণ পেয়ে একই গ্রামের দিনমজুর মনজিল মিয়া (৫০) বললেন, বন্যার সময় কাজ নাই। চেয়ারম্যানের কাছে গেলে তিনি জানান কোথায় থেকে ত্রাণ দেবো। আজ প্রথম আলো পেপারের চাল ডাল পেয়ে ভাল লাগছে। রাতে পরিবার নিয়ে পেটভরে ভাত খেতে পারবো। 

        পারদিয়ারা গ্রামের জেলে কালু মিয়া (৬৫) ত্রাণ পেয়ে বলেন, মাছ শিকার করে আমাদের জীবন চলে। কিন্তু বন্যার সময় নদে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। ধারদেনা করে চলছি। তিনি বলেন, বাড়িতে পানি ওঠায় সরকারি জায়গায় আশ্রয় নিয়েছি। দশদিন থেকে সরকারি জায়গায় আছি। কিন্তু ত্রাণ পাই নাই। অনাহার অধার্হারে দিন কাটছে। আজ প্রথম আলোর পেপারের ত্রাণের প্যাকেট পেয়ে ভাল লাগলো। কয়েকদিন পেট ভড়িয়ে ডালভাত খেতে পারবো।