গ্রামাঞ্চলের সেই ‘বইন্নার’ আছে যত গুন

হুমায়ূন কবীর ঢালী

0

বরুণকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলে বইন্না। বরুণ ফুলকে বইন্না ফুল। শ্রুতিমধুর ‘বরুণ’ শব্দটি থাকতে বইন্না নামটি কেন বেছে নিয়েছে আমাদের অঞ্চলের মানুষ বুঝে উঠতে পারি না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আঞ্চলিক শব্দের মাঝে একটা প্রাণ থাকে। আমি বইন্না নামটির ভেতর প্রাণের অভাব বোধ করছি।

যাহোক, শিশুবেলায় বরুণ ফুল, বরুণ ফল খেলার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হত। এখন বরুণ ফুল ফোটার সময়। গ্রামেগঞ্জে গেলে নয়নাভিরাম বরুণ ফুলের নান্দনিক সৌন্দর্যে বিমোহিত না হয়ে উপায় নেই। কদিন আগে সিকিরচরে গিয়ে বরুণ ফুলের নান্দনিক সৌন্দর্যে অবগাহন করে এসেছি। ছবি তুলেছি ফুল ও গাছের।

বরুণের বৈজ্ঞানিক নাম:Crateva religiosa। ইংরেজি: sacred garlic pear এবং temple plant হচ্ছে Crateva গণের একটি ফুল গাছের নাম। এদের অন্যান্য নামের ভেতর আছে বালাই লামক, অবিয়ুচ, বর্না, এবং বিদাসি। এটি জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং কতিপয় দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের স্থানীয় গাছ। এটি অন্যত্র ফলের জন্য জন্মানো হয়, বিশেষভাবে আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন অংশে।

বাংলাদেশের মানুষ অতীতকালে ফল পাকাতে এই গাছের পাতা ব্যবহার করতেন। কিন্তু ফল পাকাতে ক্ষতিকারক ক্যালসিয়াম কার্বাইডের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এই গাছের কদর নেই। বর্ষায় বরুণ ফল ঝুলে থাকতে দেখা যায়। গাছ মাঝারি ধরনের, প্রচুর ডালপালাযুক্ত। বাকল ছাই রঙা, তাতে সাদা সাদা ফোঁটাযুক্ত। পাতা যৌগিক, তিনটি পত্রক এক বোঁটায় জন্মে।

ফুল চৈত্র-বৈশাখ মাসে ফোটে। ফুলের পাপড়ি ঘিয়ে রঙের-পুংকেশর দেখতে অনেকটা বিড়ালের গোঁফের মতো। পূর্ণ প্রস্ফুটিত বরুণ গাছ বড়ই দৃষ্টিনন্দন। মাঘ-ফাল্গুনে পাতা ঝরে যায়। ফুলের পর ফল ধরে। ফল কদবেলের মতো। আমাদের দেশের চৈত্রসংক্রান্তির দিনে হাওরের নারীরা সংগ্রহ করেন বরুণ ফুল। আসছে বছরটি যাতে পরিবার ও গ্রামসমাজের জন্য মঙ্গলময় হয়, সে জন্য বরুণের ফুল গ্রামময় গেঁথে দেওয়া হয় গোবরের দলায়।

হাওরাঞ্চলে এ পর্ব আড়িবিষুসংক্রান্তি নামে পরিচিত। হাজারো ফুলের মাঝে হাওরের জলাভূমিতে বসন্তে স্নিগ্ধতা ছড়ায় বরুণ ফুল। হাওরের গ্রামগুলিতে অনেকটা অনাদর অবহেলায় বেঁচে আছে বরুণ গাছ। বরুণ ভাটি এলাকায় বেশি জন্মায়।

বরুণের প্রচুর ভেষজ গুণ রয়েছে। অর্শরোগীরা রোগে খুব কষ্ট পেলে তিল-তেলে মাখানো বরুণ পাতা জলে সিদ্ধ করে ওই জলে স্নান করলে অর্শের ব্যথা-বেদনা দূর হয়। শ্রীলঙ্কায় বাতের ফোলায় বরুণ পাতা ব্যবহৃত হয়। খাওয়ার আগে বরুণের মুকুল একটু লবণের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে ক্ষুধা বাড়ে। পিত্তপাথুরি রোগে ১০ গ্রাম বরুণের বাকল একটু কুটে নিয়ে ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করে অর্ধেক অবস্থায় নামিয়ে সকাল-বিকাল সেবন করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

মেয়েদের মুখের মেছতা দূর করতেও বরুণ উপকারী। এক্ষেত্রে বরুণ বাকল ছাগলের দুধে ঘষে দৈনিক একবার করে মুখের কালো দাগে লাগালে দাগ ধীরে ধীরে দূর হতে শুরু করে। যাদের শরীরের গাঁটে গাঁটে বাতের ব্যথা, এমনকি পায়ের তলাতেও ব্যথা ও ফোলা, তারা শুষ্ক বরুণপাতা ৫/৭ গ্রাম ৩ কাপ পানিতে সিদ্ধ করে, আন্দাজ ১ কাপ থাকতে নামিয়ে ছেঁকে পানিটা আধা গ্রাম শুষ্ক আদাচূর্ণের সঙ্গে মিশিয়ে সকালে ও বিকালে ২ বার খেলে ব্যথা ও ফোলা দুটোই কমে যাবে। অনেকে বাজার থেকে কেনা কাজল চোখে পরেন অথবা কাজলের পেন্সিল চোখে টেনে পটলচেরা চোখের নমুনা করেন।

হুমায়ূন কবীর ঢালী
শিশুসাহিত্যিক ও লেখক