তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলোও জাতীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে

নিউজ ডেস্ক: মানুষের শরীরে থাকা প্রতিটি কোষে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমের মধ্যে ২২ জোড়া হলো অটোজোম এবং এক জোড়া হলো সেক্স ক্রোমোজোম। অটোজোম দেহগঠন ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং সেক্স ক্রোমোজোম লিঙ্গ নির্ধারণে ভূমিকা পালন করে থাকে। স্ত্রীদেহে লিঙ্গ নির্ধারক ক্রোমোজোম হলো দুটি এক্স ক্রোমোজোম, অপরদিকে পুরুষদেহে লিঙ্গ নির্ধারক ক্রোমোজোম হলো এক্স এবং ওয়াই। জাইগোট পরবর্তী কোষ বিভাজনকালে বাবা-মা উভয়ের কাছ থেকে কোনো ভ্রƒণে একটি করে এক্স ক্রোমোজোম অর্থাৎ যদি এক্স এক্স যৌন ক্রোমোজোম আসে তাহলে শিশুটি হবে মেয়ে এবং মায়ের কাছ থেকে এক্স ও বাবার কাছ থেকে ওয়াই যৌন ক্রোমোজোম আসলে শিশুটি হবে ছেলে।

ভ্রƒণের পূর্ণতার স্তরগুলোতে ক্রোমজোমের প্যাটার্নের প্রভাবে ছেলে শিশুর মধ্যে অণ্ডকোষ আর কন্যা শিশুর মধ্যে ডিম্বাশয় জন্ম নেয়। অণ্ডকোষ থেকে নিঃসৃত হয় পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরন ও এন্ড্রোজেন, আর ডিম্বাশয় থেকে নিঃসৃত হয় এস্ট্রোজেন, যা দেহের সেকেন্ডারি সেক্স বৈশিষ্ট্যসমূহ নিয়ন্ত্রণ করে। ভ্রƒণসৃষ্টিপর্যায়ে জননকোষের নিষিক্তকরণ ও বিভাজনের সময়ে অস্বাভাবিক প্যাটার্নের সৃষ্টি হলে, যেমন: এক্স এক্স ওয়াই অথবা এক্স ওয়াই ওয়াই ক্রোমোজোম সন্নিবেশিত হলে সন্তানটি হবে হিজড়া। এতে শিশুটির পিতামাতার কোনো নিয়ন্ত্রন থাকে না।

এক্ষেত্রে কিছু ছেলে বা মেয়ে বিপরীতধর্মী আচরণ করে এবং বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার একটি পর্যায়ে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ কমে সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। এসময় হরমোনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে ধীরে ধীরে ট্রান্সজেন্ডার বা হিজড়ায় পরিণত হয়, যাদেরকে আমরা তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে জানি।


হিজড়ারা জন্মগতভাবেই একাধারে স্ত্রী ও পুংলিঙ্গ সংবলিত বা উভয়লিঙ্গ। তবে প্রতিটি লিঙ্গই অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট। নারীও নয় আবার পুরুষও নয়-এধরণের একটি শ্রেণিকে নারীবেশে সেজেগুজে আমরা প্রায়ই রাস্তাঘাটে বিভিন্ন রকম অঙ্গভঙ্গি করে চলতে দেখি। আমরা এই অবহেলিত শ্রেণিটিকে ‘হিজড়া’ বলে ডাকি। এদের দেখলেই আমরা কিছুটা অপ্রস্তুত হই এবং অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখি এর মূলকারণ হলো সামাজিক সচেতনতার অভাব। এরাতো প্রকৃতির নিয়মেই স্বাভাবিক মানুষের পরিবর্তে হিজড়ায় রূপান্তরিত হয়। ঠিক যেমনটি ঘটে থাকে একজন প্রতিবন্ধীর ক্ষেত্রে।

কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, প্রতিবন্ধীদের জন্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে এবং তাদেরকে সমাজের মূল স্রোতধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে নানারকম সরকারি-বেসরকারি আন্দোলন ও পদক্ষেপ নেয়া হলেও হিজড়াদের কল্যাণে এরকম কোনো কর্মসূচি চোখে পড়ে না। সভ্যসমাজ থেকে একপ্রকার নির্বাসিত এই শ্রেণিটি তাই বিকৃত মানসিকতা নিয়ে সমাজে গড়ে ওঠে। পেটের তাগিদে তারা জড়িয়ে পড়ে নানারকম অপরাধমূলক কার্যক্রমে। এই হিজড়াদের সামাজিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে পারলে তারাও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।


হিজড়া শব্দটি এসেছে আরবি হিজরত শব্দ থেকে যার আভিধানিক অর্থ পরিবর্তন। লিঙ্গ নির্ধারণের সময়ে শারীরবৃত্তীয় ত্রুটির কারণে এদের সৃষ্টি। এদের প্রধান সমস্যা হলো, এদের লিঙ্গে নারী বা পুরুষের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য থাকে না। ইসলাম ধর্ম অন্যসব মানুষের মতো হিজড়াদেরকেও একজন মানুষ হিসেবে দেখছে। তারা পুরুষ হলে পুরুষের, নারী হলে নারীর বিধান মেনে চলবে। একজন নারীর যেমন নামাজ, রোজা ও পর্দাসহ ইসলামের সব বিধানকে মানতে হয়, একজন নারী হিজড়াকেও এগুলো মেনে চলতে হবে। একইভাবে পুরুষ হিজড়াকেও পুরুষের মতো ইসলামি অনুশাসন মেনে চলতে হবে। ইসলাম ধর্মে মৃত সাধারণ মানুষের মতো তাদেরও কাফন, দাফন ও জানাজা দিয়ে কবর দেয়ার হুকুম রয়েছে। তারা এগুলো মানে না বলেই তাদের এ করুণ অবস্থা। সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এই হিজড়াদেরকে সাধারণ মানুষের মতো কবর না দিয়ে পানিতে ভাসিয়ে বা মাটির গর্তে পুঁতে রাখা হয়।


প্রতিবন্ধী মানুষের যেমন শারীরিক ত্রুটি থাকে, হিজরাদেরও তেমন কিছু শরীরবৃত্তিয় ত্রুটি থাকে। এ ত্রুটির কারণে তাদেরকে মনুষ্য সমাজ থেকে বের করে দেয়া যাবে না। বরং অন্যান্য প্রতিবন্ধীদের মতোই তারা স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার রাখে। তাদের প্রতি ঘৃণা নয়-ভালোবাসা ও স্নেহ দরকার। তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা, তাদের সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করা কাম্য নয়। গুরুত্বহীনতায় সমাজের যে কোনো মানুষ ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্নতাবাদীতে পরিণত হয়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়তে পারে। যৌন-বৈচিত্র্যের ভিত্তিতে পৃথিবীতে মোট চার ধরনের হিজড়ার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। (ক) পুরুষ, তবে নারীর বেশে চলে, তাদের আকুয়া বলে। এরা মেয়েদের বিয়ে করতে পারে। (খ) নারী, এরা নারীর বেশে চলে, তবে দাড়ি-মোঁচ আছে, তাদের জেনানা বলে। তারা পুরুষের কাছে বিয়ে বসতে পারে। (গ) লিঙ্গহীন যে বেশে থাকুন না কেন তাদের খুনসায়ে মুশকিলা বলে। এরা কোন লিঙ্গের সে বিষয়ে বিজ্ঞ চিকিৎসক সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। (ঘ) কৃত্রিমভাবে যৌনক্ষমতা নষ্ট করে বানানো হিজড়া, যারা খোজা নামে পরিচিত। হিজড়াদের শারীরিক গঠন মূলত ৩ প্রকার : (ক) নারীদের সকল বৈশিষ্ট্য থাকলেও নারী জননাঙ্গ থাকে না, (খ) পুরুষের সকল বৈশিষ্ট্য থাকলেও পুরুষ জননাঙ্গ থাকে না, (গ) উভয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।


উল্লিখিত চার ধরনের হিজড়ার মাঝে আকুয়া এবং জেনানাদের লিঙ্গ দৃশ্যমান হলেও এদের অনেকের লিঙ্গ কার্যত অক্ষম কিংবা প্রজননে ব্যর্থ। সেক্ষেত্রে তাদের জন্য বিয়ে হারাম। হিজড়াদের লিঙ্গ কিভাবে নির্ধারিত হবে সে প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হিজড়াদের নারী বা পুরুষের যে কোনো একটি শ্রেণিতে ফেলতে হবে, তাদের প্রস্রাবের রাস্তার ধরনের উপর ভিত্তি করে। গোপনাঙ্গ যদি পুরুষালি হয়, তাহলে পুরুষ। আর নারীর মতো হলে সে নারী। আর যদি কোনোটিই বোঝা না যায় তাহলে তাকে নারী হিসেবে গণ্য করা হবে অথবা বয়ঃসন্ধির সময় যদি তার বীর্যপাত নিয়মিত হয় তবে সে পুরুষ। আর ঋতুঃস্রাব নিয়মিত হলে সে মেয়ে। যদি পুরুষের দিকে আকৃষ্ট হয় তবে তাকে নারী ধরা হবে। যদি নারীর দিকে আকৃষ্ট হয় তবে পুরুষ ধরা হবে।

কিন্তু উভয়ের দিকে আকর্ষণ বা কোনো আকর্ষণ না থাকলে সে উভয়লিঙ্গই থাকবে। সে হিসেবেই তার ওপর শরিয়তের বিধান আরোপ করা হয়েছে। ইসলাম হিজড়াদের সম্মান দিয়েছে। তারা নারী-পুরুষের মতো সকল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করবে। তাদের ইবাদতও হবে সাধারণ ইবাদতের মতো। তাদেরও জানাযা এবং দাফন হবে। নামাজ, রোজা ও পর্দা করবে। ইসলাম হিজড়াদের অধিকার প্রদানে অন্য সন্তানের মতোই সম্পত্তিতে প্রাপ্য অধিকার পাবে।


একজন মানুষ হিসেবে হিজড়াদেরও কামনা-বাসনা সবই রয়েছে। অন্য আর দশজন নারীপুরুষের মতো তাদেরও বিয়ে করার অধিকার রয়েছে। তারা যদি বিয়ে করে, এটাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে আমাদের সমাজ। সমকামিতা এবং রূপান্তরকামিতা সংখ্যালঘু যৌনপ্রবৃত্তির অংশ। তথ্যমতে প্রতিটি দেশেই গড়পড়তা দশ ভাগের মতো লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করে। গবেষকদের মতে বাংলাদেশে সমকামীর সংখ্যা ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ।

এর উল্লেখযোগ্য অংশই হচ্ছে হিজড়া জনগোষ্ঠী। অথচ দেশে তাদের অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়। দেশের তথাকথিত সচেতন বুদ্ধিজীবী হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, পাহাড়ি কিংবা আদিবাসীদের অধিকারের বিষয়ে সচেতনতা দেখালেও কখনো হিজড়াদের যৌনতার স্বাধীনতা কিংবা অধিকার নিয়ে কেউ কথা বলে না। কোনো কোনো এনজিও হিজড়া ইস্যু নিয়ে কাজ করলেও হিজড়াদের সেক্সের অধিকার নিয়ে কথা বলে না।


২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে সামাজিক স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি হিজড়াদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করেছে। ২০১৯ সালের ১১ এপ্রিল ভোটার তালিকা নিবন্ধন ফরমের (ফরম-২) ক্রমিক নম্বর ১৭ সংশোধন করে লিঙ্গ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ‘পুরুষ’ ও ‘মহিলা’র পাশাপাশি ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সরকার হিজড়াদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় একই সঙ্গে তাদের সাংবিধানিক অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপে, বাংলাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার।

এই জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অতি ক্ষুদ্রাংশ হলেও আবহমানকাল থেকে তারা সমাজের অবহেলিত ও অনগ্রসর গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার এ জনগোষ্ঠীর মর্যাদা নিশ্চিত করে পারিবারিক, আর্থ-সামাজিক, শিক্ষা, বাসস্থান, স্বাস্থ্যগত উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ; সর্বোপরি তাদেরকে সমাজের মূলধারায় এনে দেশের সার্বিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত করতে সরকার এগিয়ে এসেছে ।


তৃতীয় লিঙ্গের সাংবিধানিক স্বীকৃতি পাওয়ায় হিজড়ারা সমাজ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। শুধু স্বীকৃতি দিলেই হবে না, রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তাদেরকে কাজের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। করুণা নয়, দক্ষতার ভিত্তিতেই তারা কাজের সুযোগ চান। হিজড়ারা চাঁদাবাজি করে মিডিয়ায় এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ করা হয়। কিন্তু তাদের দুর্ভোগের কথা কেউ তুলে ধরে না। তারাও মানুষ! তাদেরও সমাজে বেঁচে থাকার এবং চলাফেরা করার অধিকার রয়েছে। অথচ রাষ্ট্রের কোথাও তাদের স্থায়ী কোনো বাসস্থান নেই। কেউ তাদের ভালো চোখে দেখে না। কোনো বাড়ির মালিক তাদের বাসা ভাড়া দিতে চান না। কোনো প্রতিষ্ঠানেই তাদেও চাকরির সুযোগ দেয় না। খেলতে গেলে কেউ তাদেরকে খেলতে নেয় না। সবাই হাসিঠাট্টা করে। বাড়িতে এসব বললে বাবা-মা-ভাই সবাই মারধর করে।

একদিকে বাড়িতে অন্যায়-অত্যাচার, লাঞ্ছনা-বঞ্চনা, অন্যদিকে সমাজের তিরস্কার চলে প্রতিনিয়ত। তারাও সুযোগ চায়, মানুষের মতো বেঁচে থাকতে চায়। সম্মান চায়, অধিকার চায়। এদেরকে সামাজিকভাবে আড়চোখে না দেখে একজন মানুষের মতো সুবিধা দিতে হবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে স্থায়ী ব্যবস্থা নিলে হিজড়ারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষ করে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে তারা স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবন লাভে সক্ষম হবে।


ফার্সি ভাষায় হিজড়া অর্থ হল ‘সম্মানিত ব্যক্তি’। এ মানব সম্প্রদায় সম্পর্কে আমাদের মন-মগজে এক নেতিবাচক বদ্ধ ধারণা বিদ্যমান রয়েছে। সৃষ্টিগতভাবে অনেক মানুষের হাত নেই, পা নেই, কেউ চোখে কম দেখে, কেউ কানে কম শোনে, কেউ কথা বলতে পারেনা, কারো বুদ্ধি কম, তবু এরা সবাই এক আল্লাহর সৃষ্টি। এদেরকে আমরা প্রতিবন্ধী বলি। কিন্তু অবহেলায় ফেলে দেই না। বরং বেশি আন্তরিক হই।

হিজড়ারাও এক ধরনের প্রতিবন্ধী, ইসলামের সকল হুকুম-আহকাম জানার-মানার অধিকার ও দায়িত্ব তাদেরও রয়েছে। ইসলাম হিজড়াদেরকে গুরুত্বহীন মনে করে না বিধায় সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে তাদের জন্য পরিস্কার নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। ইসলামি শরীয়া অনুযায়ী হিজড়া সন্তান তাদের মা-বাবার সম্পত্তির ভাগ পাবে এবং উত্তরাধিকার সূত্রে যে হিজড়া নারী প্রকৃতির সে নারী এবং যে পুরুষ প্রকৃতির সে পুরুষের হিস্যা অনুযায়ী সম্পত্তির ভাগ পাবে। আর যে নারী নাকি পুরুষ এর কোনটিই চিহ্নিত করা যায় না সে তার প্রস্রাবের পথের অবস্থা অনুযায়ী লিঙ্গ চিহ্নিত হয়ে সম্পত্তির ভাগ পাবে।


লিঙ্গ প্রতিবন্ধীরা আমাদের সভ্য সমাজেরই কারো না কারো সন্তান। তাদেরও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে দিতে হবে। পরিবারের অন্য সদস্যদের মতই তারাও বড় হবে, শিক্ষা লাভ করবে, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে?। আমাদের নবী যখন আরব ভূমিতে আগমন করেন তখন আরবের ঘরগুলোতে কন্যা সন্তান জন্ম নেয়া লজ্জার ছিল। কিন্তু ইসলাম যখন কন্যা সন্তানের মর্যাদা ঘোষণা করল তখন নারী হয়ে উঠল সমাজের মর্যাদাশীল। লিঙ্গ প্রতিবন্ধীতা নিয়ে জন্মানোয় লজ্জার কিছু নেই। তাকে সুস্থ ভাবে লালন-পালন করাই হবে গৌরবের বিষয়।

আমাদের দেশে নারী আছে, পুরুষ আছে এবং তৃতীয় লিঙ্গ আছে এটা আমাদের গৌরব। বাংলাদেশ সরকার একটি সুন্দর হিজড়া সমাজ গড়ে তোলার জন্য নানা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ আইন কমিশন সুপারিশকৃত বৈষম্য বিলোপ আইন ২০১৪ প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হিজড়াদের জন্য পঞ্চাশের বেশি বেসরকারি সংস্থা ও সংগঠন রয়েছে এবং তাদের রয়েছে নানা রকম প্রকল্প ও কর্মসূচি। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাগুলো বলছে তাদের কাছে ১৫ হাজার হিজড়ার তালিকা আছে। তবে আসল সংখ্যা আরও বেশি হবে, কারণ অনেক হিজড়া তাদের পরিচয় গোপন করায় গণনা করা সম্ভব হয়নি। ভোটার আইডি কার্ডে জেন্ডার নির্ধারণ না থাকায় সেখানেও রয়েছে বিভিন্ন বিড়ম্বনা। ২০১২ সালে প্রথম বারের মতো হিজরা শিশুদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি ও প্রশিক্ষণ-এর ওপর পাইলট প্রকল্প শুরু হয়েছে। সরকারি উদ্যোগের সাথে মিলে অন্যান্য সংস্থা ও সংগঠন বাস্তবসম্মত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।


হিজড়াদের একটা অংশ ভিক্ষাবৃত্তি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, বকশিশ তোলা ইত্যাদি কর্মে লিপ্ত। এই কাজগুলো করার জন্য সাধারণত তারা নানা কৌশল বেছে নেয়। কারো কারো ক্ষেত্রে দেখা যায় লিঙ্গ নির্ধারক অঙ্গ থাকে না। অধিকাংশ হিজড়ার স্ত্রী ও সন্তান থাকার পরও চিকিৎসার মাধ্যমে শারীরিক গঠন পরিবর্তন করে সমাজে হিজড়া হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছে। এদের ভেতর কেউ কেউ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে স্ত্রী অথবা পুরুষ রূপে আত্মপ্রকাশ করে। একটি চক্র সুস্থ মানুষের অঙ্গহানি করে হিজড়া বানিয়ে ফেলছে। কেউ নিজের আগ্রহেই হিজড়া হচ্ছে। হিজড়াদলের প্রলোভনে পড়ে অনেক মানুষ নিজের লিঙ্গ পরিবর্তন করে হিজড়াদের দলে যোগ দেয়। চক্রটি সরলমনের সপ্তম-অষ্টম শ্রেণির সুন্দর ছেলেদের ফুসলিয়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে অজানা কোথাও নিয়ে যায়। পরে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ডাক্তারের মাধ্যমে পুরুষাঙ্গ কেটে, ওষুধ খাইয়ে বা অপারেশন করে শরীরের অঙ্গ বিকৃত করে বা হরমোন ইনজেকশন নিয়ে স্তন বড় করে এদের হিজড়ার খাতায় নাম লেখায়। অসচেতনতা, অর্থ উপার্জন এবং অভাব একাজকে ত্বরান্বিত করছে।


হিজড়া মানেই বড় কোনো সমস্যা নয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। হিজড়া-বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মানো কোনো শিশুর পরিণত বয়সে যাওয়ার আগে চিকিৎসা করানো গেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাকে সুস্থ করা সম্ভব। আধুনিক প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে যৌনাঙ্গ প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। কলকাতা-সহ ভারতের বেশ কয়েকটি শহরে এই ধরনের সার্জারি করা হয়ে থাকে। চিকিৎসার পরিভাষায় এই অস্ত্রোপচারকে জেনিটাল সার্জারি বলা হয়। জেনিটাল সার্জারির মাধ্যমে কোনো মানুষের বর্তমান লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন ঘটানো হয়। অর্থাৎ অস্ত্রোপচারে আগ্রহী মানুষটি তাঁর ইচ্ছে মতো নারী বা পুরুষ-যৌনাঙ্গের অধিকারী হতে পারেন। একে সেক্স রিঅ্যাসাইনমেন্ট সার্জারি কিংবা জেন্ডার রিঅ্যাসাইনমেন্ট সার্জারি বলে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে এ ধরনের অস্ত্রোপচারের সুযোগ আছে। চিকিৎসকরা বলছেন, যৌনাঙ্গে অসঙ্গতি ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবকের উচিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। জন্মের ছয় মাস পর থেকে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত চিকিৎসা করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। অসংগতি অল্প হলে একটি অস্ত্রোপচারেই শিশু স্বাভাবিক জীবন পেতে পারে। কখনো কখনো কয়েক ধাপে অস্ত্রোপচার করতে হতে পারে।

বাংলাদেশে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যৌনাঙ্গে অসঙ্গতির চিকিৎসা চলছে। গত চার বছরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই অস্ত্রোপচার হচ্ছে। যদিও এই হাসপাতালে নামমাত্র মূল্যে বা বিনামূল্যে চিকিৎসার সুযোগ আছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের অভিমত হলো, শিশুকালে সচেতন থাকলে অনেক ক্ষেত্রে হিজড়া সমস্যার আরোগ্য সম্ভব। তবে মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। উল্টো হিজড়া সন্তানকে অভিশাপ মনে করা হয়। হিজড়াদের ঘৃণা না করে তাদের সামাজিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। হিজড়াদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য ‘প্রথমত হিজড়া অপারেশন কেন্দ্র বন্ধ এবং এর ডাক্তারদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়ে এগুলো দমন করতে হবে।


ভারতের অমলা হিজড়া ছিল অপূর্ব সুন্দরী। সে স্বাভাবিকভাবেই চলাফেরা করতে পারত, কেউ তাকে বুঝতে পারত না। একদিন সে গ্রামের একটি বিয়েতে যায়। সেখানে তাকে দেখে গ্রামের এক যুবক, যার নাম কার্তিক। পরে সে তাকে বিয়ে করতে চায়, কিন্তু অমলা তার সমস্যার জন্য কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। তবে কার্তিকও নাছোড়বান্দা, পিছু হটবার পাত্র নয়। শেষ পর্যন্ত আর কোনো উপায় না পেয়ে তাকে আসল ব্যাপারটি জানায়। জানার পরও তাকে বিয়ের ব্যাপারে পিছু হটে না কার্তিক। তার যুক্তি, শরীরের চেয়ে মনের ভালোবাসা অনেক বড়, তাই সে তাকে বিয়ে করবেই। এরপর অমলার পরিবারের সহযোগিতায় তাদের বিয়ে হয়। কিন্তু কার্তিক সমাজ ও তার পরিবার থেকে বিতাড়িত হয়। তাদের বিয়ের পর বেশ কিছুদিন গেলে কার্তিক একদিন পত্রিকা দেখে জানতে পারে এরকম একটি শিশু চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়েছে। এটা জানতে পেরে সে অমলাকেও সেখানে নিয়ে যায়। ডাক্তার অমলাকে দেখে জানায় এই বয়সে এটা চিকিৎসার মাধ্যমে সফল হওয়া অসম্ভব। কিন্তু কার্তিকের পীড়াপীড়িতে ডাক্তার তার সমস্যাটি দেখেন এবং অমলার অপারেশনের উদ্যোগ নেন।

অস্ত্রোপচারের পর অমলা একজন সম্পূর্ণ নারীতে পরিণত হন এবং পরবর্তীকালে তিনি সন্তানের জন্মও দেন। এ ব্যাপারে সেই ডাক্তারের অভিমত হলো, প্রকৃত অর্থে অমলার ত্রুটিটি ছিল খুবই সামান্য এবং তার মধ্যে নারী-বৈশিষ্ট্য প্রকটভাবে বিদ্যমান ছিল।


ভারতীয় উপমহাদেশে যারা ট্রান্সজেন্ডারাই মুলত হিজড়া নামে পরিচিত। ট্রান্সজেন্ডার হলো তারা, যাদের দৈহিক বা শারীরিক লিঙ্গের সাথে মনোলিঙ্গের কোনো সামঞ্জস্য নেই। ট্রান্সজেন্ডাররা এক ধরনের দেহ ও আরেক ধরনের মন নিয়ে জন্মায়। মানে, ট্রান্সজেন্ডার ছেলেরা শরীরের দিক থেকে ছেলে হলেও তাদের মস্তিষ্ক থাকে মেয়ের। আবার মেয়েরা শরীরের দিক থেকে মেয়ে হলেও তাদের মস্তিষ্ক থাকে ছেলের। এই ছেলেগুলো শারীরিকভাবে ছেলে হবার পরও মানসিকভাবে মেয়ে হবার কারণে তাদের মধ্যে মেয়েলি হাবভাব থাকে, তারা নিজেদেরকে মেয়ে ভাবে।

আর এ নিয়ে তারা পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও সমাজের মানুষের হাসিঠাট্টা, বাঁকা কথা ও অপমানের স্বীকার হয়। এছাড়া তারা মানসিকভাবে মেয়ে হবার কারণে কোনো মেয়ের সাথে সেক্স করতে বা বিয়ে করতে আগ্রহী হয় না, বরং ছেলেদের সাথে সেক্স করতে বা বিয়ে হতে আগ্রহী হয়। কিন্তু এটা সম্ভব হয়ে ওঠে না বা মানুষ তা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয় না। মূলত এই দুটো কারণেই তারা বাধ্য হয়ে হাজারো অভিমান আর কষ্ট নিয়ে হিজড়া ডেরায় আশ্রয় নেয়। আবার, ট্রান্সজেন্ডার মেয়েগুলো দৈহিক বা শারীরিকভাবে মেয়ে হলেও মানসিকভাবে হয় ছেলে। তারা নিজেদের ছেলে ভাবে। তাদের স্বভাবেও থাকে কিছুটা ছেলেমি হাবভাব।

তারা শারীরিকভাবে মেয়ে হবার পরও মানসিকভাবে ছেলে হওয়ার কারণে তারা মেয়েকেই পছন্দ করে এবং নিজেকে মনে মনে ছেলে ভেবে মেয়েদের সাথেই যৌনতায় আগ্রহী হয়, যে কারণে সমাজের লোকেরা তাদেরকে সমকামী হিসেবে চিহ্নিত করে।

লেখক: অধ্যাপক ড. মো. লোকমান হোসেন।