বিশ্বজয়ী শামীম ও জয়কে চাঁদপুর জানালো গণসংবর্ধনা

মাহফুজুর রহমান: কথায় আছে ‘ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে’। এ যেন এক আপন ভূমি, নিজেদের মাতৃভূমি। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলের গর্বিত দু’জন শামিম ও জয় এবার বিশ্ব কাঁপিয়ে ফিরে এসেছে তাদের জন্মভূমি চাঁদপুরে।

সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বাঁধভাঙা উৎসব-আমেজে বীরের বেশে বৃহস্পতিবার (১৩ ফেব্রুয়ারী) চাঁদপুরের মাটি ছুঁয়েছেন জেলার এই দুই রত্ন। সকালে লঞ্চযোগে চাঁদপুর পৌছানোর পর লঞ্চঘাট পরিপূর্ণ হয় জনতার ঢলে। প্রশাসিক, রাজনৈতিক, সাংবাদিক সহ সর্বস্তরের মানুষ ভিড় করে তাদের গর্বিত সন্তানদের বরণ করে নেওয়ার জন্য। দু’জনকে স্মরণীয়-বরনীয় করতেই বিজয় সুরে ধ্বনিত হয় গোটা জেলা।

এসময় চাঁদপুর জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, চাঁদপুর পৌরসভা, জেলা ক্রীড়া সংস্থাসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠন তাৎক্ষণিক তাদের সংবর্ধনা জানায়। ফুলে ফুলে, আনন্দে-উল্লাসে মুখরিত হয় তাদের পদচারণা।

এরপরই তাদের গাড়ি বহরটি তাদের নিজ উপজেলা ফরিদগঞ্জে পৌছায়। সেখানে ফরিদগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সামনে এসে পৌছালে উপজেলা পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা তাদের সংবর্ধনা জানায়। ফরিদগঞ্জেও নামে বিশাল জনতার ঢল। দিনব্যাপী জেলার বিভিন্ন মহলের ফটো সেশন ও ফুলের মালায় মুখরিত হয় তাদের সোনা মুখখানা।

মাহমুদুল হাসান জয়ের বাড়ি ফরিদগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের পশ্চিম লাড়ুয়া গ্রামে। একই উপজেলার গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের ধানুয়া গ্রামের ছেলে শামীম পাটওয়ারী।

খেলোয়াড়ি জীবনের শুরুতে দু’জন চাঁদপুর ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমি থেকে যাত্রা শুরু করেন। বর্তমানে তারা দুজনই বিকেএসপির ছাত্র হিসেবে অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের হয়ে খেলছেন।

চট্টগ্রামে ভারতের সিবিএ দলের টেস্ট ম্যাচে শামিম পাটওয়ারী অপরাজিত ডাবল সেঞ্চুরি করে এতদিন আলোচনায় থাকলেও কিছুটা আড়ালেই ছিল মাহমুদুল হাসান জয়ের কথা। অবশেষে সেমিফাইনালে নিজের সেঞ্চুরি করে দলের বিজয় নিশ্চিত করে নিজের জাত চেনালেন এই কৃতী ক্রিকেটার।

ওদিকে, পঞ্চম শ্রেণির পাঠ চুকানোর পর জয়ের বড় ভাই রাশেদুল হাসান জুমন তাকে নিয়ে যান চাঁদপুর ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমির প্রধান শামীম ফারুকীর কাছে। সেখানেই জয়ের শক্ত হাতে ব্যাট ধরার হাতেখড়ি। মাত্র দু’বছরের মধ্যেই প্রতিভা ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই ২০১৪ সালে জয় চলে যান বিকেএসপিতে। এশিয়া কাপ দিয়ে শুরু হয় মাহমুদুল হাসান জয়ের বিশ্ব ভ্রমণ। আজ সে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য।

অনুভুতি জানাতে গিয়ে চাঁদপুর ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমির প্রধান শামীম ফারুকী জানান, এতদিনের পরিশ্রম আজ স্বার্থক করলো তার দুই কৃতী শিক্ষার্থী শামীম এবং জয়। চেষ্টা করেছি শিশু-কিশোরদের দক্ষ করে তৈরি করার। তাদের সেভাবে ঝালাই এবং যোগ্য করে গড়ে তোলেন। তাই তো এমন ২ জন ছেলেকে জাতীয় এবং বিশ্ব পর্যায়ের ক্রিকেটে অবদান রাখার অবস্থান তৈরি করে দিতে পেরেছেন।

জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বাবু জানান, জেলার ক্রীড়া অঙ্গনে শামীম ও জয় আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে নাম লেখালো। তাদের পদচারণা পরের প্রজন্মের জন্য দিকপাল হয়ে থাকবে বলে আশা করি। তারা আমাদের চাঁদপুরকে বিশ্বব্যাপী আলোকিত, আলোড়িত করবে এই শুভ কামনা সবসময়।

ফরিদগঞ্জের দুই কৃতী ক্রিকেটারের এমন উত্থানে বিপুল খুশি উপজেলাবাসী। তারা এই ধারাবহিকতা ধরে রাখতে ফরিদগঞ্জে একটি স্টেডিয়াম নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে যাতে প্রকৃত মেধাবীরা মূল্যায়িত হয়। উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত খেলাধুলা আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের দাবি তোলেন তারা।

ফরিদগঞ্জ উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক নুরুন্নবী নোমান জানান, মাহমুদুল হাসান জয় ও শামীম পাটওয়ারী আমাদের ফরিদগঞ্জ তথা চাঁদপুরকে গর্বিত করেছে। আশা করছি আগামি দিনগুলোতে তাদের দেখে ফরিদগঞ্জ উপজেলা থেকে আরো মেধাবী ক্রিকেটার তৈরি হবে। তবে এজন্য প্রয়োজন প্রচুর খেলাধুলা ও প্রশিক্ষণ। যাতে এসব প্রতিভাকে আমরা দ্রুত আমাদের নাগালে নিয়ে নিতে পারি।

এদিকে বিশ্বকাপ জয়ী শামীম ও জয়ের এমন সাফল্যে তাদের গ্রামের বাড়িতে চলছে বাধ ভাঙ্গা জয়ের উল্লাস, আর মানুষের মুখে চলছে বিশ্বকাপ জয়ের টান টান উত্তেজনার মুহু মুহু বাক ও আলোচনা। গ্রামের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে বিশাল আনন্দ মিছিল আর মিষ্টি বিতরণের হিড়িক চলছে।